‘বাবা থাকলে খাবারের কষ্ট হতো না’

‘মা, বাবা কখন আসবে?’, ‘বাবা কেন ঘরে থাকে না?’, ‘কোথায় গেছে বাবা?’ মামলা আতঙ্কে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে থাকায় বাবাকে খুঁজছে সন্তান। কেঁদে কেঁদে মায়ের কাছে জানতে চাইছে বাবা কোথায়।

গত কয়েকদিন ধরে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার বাচোর ইউনিয়নের ভাংবাড়ি মহেশপুর ও ফুটকিবাড়ি গ্রামের কয়েকটি পরিবারের শিশুদের এসব প্রশ্নে নিশ্চুপ মায়েরা। কোনো উত্তর নেই তাদের কাছে।

গত ২৭ জুলাই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে একটি ভোটকেন্দ্রে ফলাফল ঘোষণার পর পুলিশের গুলিতে ৯ মাস বয়সী এক শিশু নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত হয় আরও বেশ কয়েকজন।

পরে নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনায় প্রিজাইডিং অফিসার ও পুলিশের পক্ষ থেকে অজ্ঞাতনামা ৮০০ জনের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়। এর জের ধরে গ্রেপ্তার আতঙ্কে পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে গ্রাম। এতে আতঙ্কে রয়েছেন নারীরাও।

এদিকে অবুঝ শিশুরা নির্বাচনী সহিংসতা, মামলা বোঝে না। কয়েকদিন ধরে বাবাকে দেখতে না পেয়ে কাঁদছে তাদের মন। বর্তমানে রাস্তায় দূর থেকে মানুষ দেখলেই ছুটে যায় তারা।

সরেজমিনে জানা যায়, যারা গ্রেপ্তার আতঙ্কে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা অনেকেই বাচোর ইউনিয়নের ভোটার নন। কেউ নদী ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে বগুড়া থেকে এসেছেন, কেউ এসেছেন হাতীবান্ধা বা ঢাকার সাভার থেকে। তারপরেও মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান রেখে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাদের।

মহেশপুর গ্রামের শিশু রাসেল, ইসরাফিল বলে, ‘আমাদের গ্রামে একটা বাচ্চা মারা গেছে। এজন্য বাবা বাড়িতে থাকতে পারে না। ছোট ভাই বাবার জন্য কাঁদে। রাতে অনেক ভয় করে। কষ্ট হয়। আমরা স্কুল যেতে পারি না। বাড়িতে বাজার নেই, মা রান্না করে না। আজ বাবা থাকলে খাবারের কষ্ট হতো না।’

রাসেল, ইসরাফিলসহ আরও কয়েকটি শিশু জানায়, দু’একদিন পর পর তাদের এলাকায় পুলিশের গাড়ি যায়। তাদের মা-চাচীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। সব মিলিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায় তারা।

অপরদিকে বাড়িতে যে মানুষটি আয়-রোজগার করেন তার অনুপস্থিতিতে বিপাকে পড়েছেন গৃহবধূরা। বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হচ্ছে তাদের। যদিও আতঙ্কিত না হয়ে প্রত্যেককে নিজ বাড়িতে থাকার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর হোসেন।

উল্লেখ্য, গত ২৭ জুলাই রাণীশংকৈলের তিনটি ইউনিয়নে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন ৯ মাস বয়সী শিশু সুরাইয়াকে নিয়ে মা মিনারা বেগম রাণীশংকৈল ভাংবাড়ি ভিএফ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে যান। ভোটগ্রহণ শেষে ফলাফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ভাংবাড়ি ভিএফ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে পরাজিত ইউপি সদস্য সমর্থকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি ছুড়লে নিহত হয় শিশু সুরাইয়া।

Back to top button