বাবার গর্বিত সন্তান, একজন গর্বিত সৈনিক নিপা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগরের একটি ছোট গ্রামে জন্ম নিপা আক্তারের। বাবা মো. সূর্য মিয়া ছিলেন একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। আর মা মিনা বেগম ছিলেন গৃহিনী। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে নিপা হলেন চতুর্থ।

প্রায় বছর খানেক আগে মারা যান নিপার বাবা। সন্তানদের মধ্য থেকে একজনকে হলেও সৈনিক বানাতে চেয়েছিলেন তিনি। মৃত বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন নিপা। যোগ দিয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সৈনিক হিসেবে। শুধু তাই নয় প্রশিক্ষণের সময় শারীরিক উৎকর্ষে সেরা নবীন সৈনিকের (মহিলা) পুরস্কারও পেয়েছেন নিপা।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বায়তুল ইজ্জতে অবস্থিত বর্ডার গার্ড ট্রেনিং সেন্টার অ্যান্ড কলেজের বীর উত্তম মুজিবুর রহমান প্যারেড গ্রাউন্ডে বিজিবির ৯৭তম ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী অনুষ্ঠানের মাঠে নিপার সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।

সেই প্রশিক্ষণ সমাপনী অনুষ্ঠানে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলামের কাছ থেকে শারীরিক উৎকর্ষে সেরা নবীন সৈনিক (মহিলা) হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন নিপা আক্তার। বিজিবির ৯৭তম রিক্রুট ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করেছেন নিপা আক্তার।

নিপা বলেন, ‘মানুষে বলে যে ওখানে(বিজিবিতে) গেলে মেয়েরা পারবে না। শুধু ছেলেরাই পারবে। কিন্তু না, অন্যায় দুর্নীতি এগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারবো ইনশাআল্লাহ। এভাবেই আমারা গড়ে উঠেছি। বিজিবির একজন সদস্য হিসেবে আমি খুব গর্বিত।’

নারী হিসেবে বিজিবিতে যোগাদানের অনুভূতি কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এখন দিনে দিনে এগিয়ে যাবো। কখনো পিছিয়ে যাবো না। যুদ্ধ দেখে আমি ভয় পাবো না। এই মনোবল বাড়িয়ে দিয়েছে আমার এই প্রশিক্ষণ ও পুরস্কার। এই বাহিনীতে এসে আমার মনোবল বহুগুণ বেড়েছে।’

নিজের মৃত বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নিপা বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল একজন ডিফেন্সের লোক হওয়ার। আমার বাবারও খুব স্বপ্ন ছিল। বাবা নেই তাই আমার স্বপ্ন পূরণটা দেখে যেতে পারলো না। আমি যে বিজিবিতে যোগদান করেছি এবং আজ এত বড় পুরস্কার পেয়েছি। বাবা যদি থাকতো তাহলে ওনার কষ্টটা দূর হতো। কিন্তু আমার বাবা দেখতে পারলো না। আমি আমার বাবার একজন গর্বিত সন্তান, একজন গর্বিত সৈনিক।’

মায়ের অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাবা এক বছর আগে মারা গেছেন। তিনি পেশায় ব্যবসায়িক ছিলেন। আমরা পাঁচ বোন এক ভাই। আমার চতুর্থ। আমার মা এত খুশি যে উনি কান্না করে দিছে। যেহেতু বাবার এত স্বপ্ন ছিল। আমি আমার বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি। আমি বাবার মেয়ে হিসেবে গর্বিত এবং সৈনিক হিসেবেও গর্বিত।’

বিজিবিতে কিভাবে এলেন জানতে চাইলে নিপা বলেন, ‘আমি এইচএসসি পাশ করেছি। অনার্সে ভর্তি হয়েছি বান্চারামপুর সরকারি কলেজে।। আমি আসলে বিজিবিতে কিভাবে আসতে হয় সেটাও জানতাম না। অনেকে চাকরি করে দেখে আমি উৎসাহ পেতাম। আমি যতটুকু এসেছি এখানে নিজ প্রচেষ্টায়।’

প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘স্যাররা যখন ট্রেনিং করাতো। তখন কখনোই আমি ভাবতাম না যে এটা আমি পারবো না। যখন কোনটা পারি নাই তখন স্যারদেরকে বলেছি যে, স্যার আমি এটা বুঝতেছি না। কিন্তু আমি কখনোই পিছিয়ে যাই নাই।’

ফায়ারিং প্রশিক্ষণে প্রথম গুলি ছোড়ার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘প্রথম যখন তখন মনের উৎসাহ নিয়েই করেছি। কিন্তু একটু ভয় তো লাগেই। সিভিলে যখন ছিলাম তখন তো এগুলো দেখি নাই। এখানে এসে অস্ত্র হাতে নিয়েছি। অস্ত্র হাতে নেওয়ার সময় বুক তো একটু ধড়ফর করেই। এখন আর করে না। মনে চায় আরও ফায়ার করি। শত্রু দেখলে কখনোই পিছিয়ে যাবো না। এটাই শিক্ষা নিয়েছি।’

উল্লেখ্য, বিজিবির ৯৭তম রিক্রুট ব্যাচের মৌলিক প্রশিক্ষণ গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ সালে শুরু হয়। বিজিটিসিএন্ডসিতে প্রশিক্ষণ নেওয়া মোট ৬৭০ জন রিক্রুট এর মধ্যে ৬২১ জন পুরুষ এবং ৪৯ জন নারী রিক্রুট প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। একই দিনে ও একই সময়ে চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়ন (৬বিজিবি)-এর প্রশিক্ষণ ভেন্যুতে ৯৭তম রিক্রুট ব্যাচের ২১৫ নবীন সৈনিকের মৌলিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে।

দীর্ঘ ২৪ সপ্তাহের অত্যন্ত কঠোর ও কষ্টসাধ্য এ প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করে বর্ণিত দুইটি ভেন্যুতে সর্বমোট ৮৮৫ জন নবীন সৈনিক আজ আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ ও সমাপনী কুচকাওয়াজের মাধ্যমে তাদের সৈনিক জীবনের শুভ সূচনা করে। প্রশিক্ষণে বিজিটিসিএন্ডসিতে ৯৭তম রিক্রুট ব্যাচের সেরা চৌকস রিক্রুট হিসেবে ১ম স্থান অধিকার করেন বক্ষ নম্বর-৪৪২ রিক্রুট (জিডি) নুরুল হুদা মামুন এবং চুয়াডাঙ্গায় ৯৭তম রিক্রুট ব্যাচের সেরা চৌকস রিক্রুট হিসেবে ১ম স্থান অধিকার করেন বক্ষ নম্বর-১১৮৩ রিক্রুট (জিডি) মো. জুবায়ের আলী।

Back to top button