ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের চোখে ৮ বছর ধরে দেখছেন রেশমা

আজ অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। বাংলা ভাষা-ভাষী সকলের জন্য গৌরবোজ্জ্বল একটি দিন। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সৈনিক আব্দুল মতিনের ভূমিকার কথা সবারই জানা। আজ ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন না থাকলেও তার চোখে পৃথিবীর আলো দেখছেন মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার গৃহবধূ রেশমা নাসরীন (৪০)।

রেশমা সিংগাইর উপজেলার চর আজিমপুর এলাকার আব্বাস আলীর স্ত্রী। স্বামী আব্বাস আলী একজন ব্যবসয়ী। রেশমা স্বামী ও ১৫ বছরের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মীম এবং ৩ বছরের ছেলে সন্তান রাইয়ান বিন আয়ানকে নিয়ে বেশ সুখেই আছেন।

২০১৪ সালের ৮ অক্টোবর সাতাশি বছর বয়সে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত অসুস্থতায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে জান ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন। মৃত্যুর পূর্বে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই নিজের দেহ দান করে যান চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার জন্য এবং তার চোখ দুটি দান করে দিয়ে যান সন্ধানীকে।

সেসময় টিভিতে ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের মৃত্যু ও তার চোখ দুটি সন্ধানীকে দান করে যাওয়ার খবর প্রচার হলে সন্ধানীর সাথে যোগাযোগ করেন ধামরাইয়ের রেশমা নাসরীন ও তার পরিবার। রেশমার তখন বাম চোখের কর্নিয়ায় সমস্যা ছিলো। পরে ওই মাসেরই ১৪ অক্টোবর সন্ধানী চক্ষু হাসপাতালে রেশমার বাম চোখে ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের দান করা একটি কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়।

সেদিন রেশমার আগে ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের আরেকটি কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয় ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার বাংলাবাজার চাঁদগাজী স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক ইকবাল কবিরের বাম চোখে।

অহঙ্কারমুক্ত লোভ লালসাহীন একজন সহজ-সরল মানুষ ছিলেন ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন। ক্ষমতার মোহ তাকে কখনো কাবু করতে পারেনি। তিনি সাধারণভাবে জীবন কাটিয়েছেন। তিনি সবসময় দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ভাবতেন। মরে গিয়েও তিনি দুজনকে পৃথিবীর আলো দেখার সুযোগ করে দিয়ে যান।

রেশমা নাসরীন জানান, আমি ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের কর্নিয়া পাওয়ার পরই তার পরিবারের সাথে দেখা করতে চাই। কিন্তু আমি খুঁজে পাইনি। প্রায় আট বছর অপেক্ষা করার পর কিছু দিন আগেই আমি ভাষা সৈনিকের পরিবাবের সাথে দেখা করেছি। আমি এখন খুব খুশি।

তিনি বলেন, আমি দু’চোখ দিয়েই দেখতে পাই। যদিও আমার চশমা লাগে। তারপরও এটা আমার পরম সৌভাগ্য যে, আমি শুধু একটি নতুন চোখই পাইনি, আমি একজন ভাষা শহীদের চোখ পেয়েছি। ভাষা মতিন শুধু বায়ান্নর ভাষা আন্দলনের সাহসী সৈনিকই নয়। তিনি ছিলেন এক অন্যরকম মানুষ। লোভ লালসা, ক্ষমতার মোহ তাকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। আমি আমার দুই সন্তানকেও ভাষা মতিনের আদর্শে গড়ে তুলব ইনশাআল্লাহ। কারণ আজকে আমি পৃথিবীর আলো দেখছি একজন মহান মানুষের কর্ণিয়া দিয়ে।

রেশমার মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস মীম বলেন, ‘আমরা যখন জানলাম মায়ের চোখ নষ্ট হয়ে গেছে, চোখের কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করতে হবে। আমরা খুবই ভয় পেয়েছিলাম। আমি একা একাই স্কুলে যেতাম। আমার বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে সব সময় তার মায়েরা থাকতো আমার সাথে আমার আম্মু যেতে পারত না স্কুলে। এই বিষয়টা আমার খুবই খারাপ লাগত।

মায়ের চোখ ভাল হয়ে যাওয়ার পর আমি ও আমার পরিবার খুবই আনন্দিত। ভাষা শহীদ আব্দুল মতিনের চোখে আমার মা নতুন করে আলো দেখতে শুরু করেছে এটা আমার কাছে খুব গর্বের। আমার মা চায় আমিও যেন ভাষা শহীদ আব্দুল মতিনের মত সৎ ও নিষ্ঠাবান হয়ে দেশের কাজে লাগতে পারি।’

Back to top button