পিছু লেগে আমার সংসারটা ভাঙবেন না : সাংবাদিকদের প্রতি রওশন

‘আমার স্বামী কী অন্যায় করেছে সেটা বিষয় না, সে আমাকে ভালোবাসছে; আমিও তাকে ভালোবাসছি। সে ১৫ বছর যাবৎ আমার পঙ্গুত্বকে বরণ করছে। একমুহূর্তের জন্য আমাকে কষ্ট দেয়নি, আমাকে ছেড়ে যায়নি। দয়া করে আমার সংসারটা আপনারা ভাঙবেন না।

আমার স্বামীকে নিয়ে অপবাদ দেবেন না। আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে গেলে আমার দুনিয়াতে কিছুই থাকবে না। আমার একটা ফুটফুটে মেয়ে আছে, তার জীবনে কেউ থাকবে না। দেশের ভাই-বোনের কাছে অনুরোধ, আমি একজন প্রতিবন্ধী, আমি কারো বোন, কারো সন্তানতুল্য। দয়া করে আমাদের পেছনে লাগবেন না। আপনাদের কাছে আকুল আবেদন, আমার সংসারটা আপনারা ভাঙবেন না। ‘
এভাবেই কালের কণ্ঠের সামনে আর্তনাদ করতে থাকেন ‘বিরল ভালোবাসা’র জুটি প্রতিবন্ধী রওশন আরা।

এ ব্যাপারে মিডিয়ায় বাড়াবাড়ি না করতে আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সোহেলের আগের সংসার নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। সে আমাকে ভালোবাসে, এটি মিথ্যা নয়। প্রায় ১৫টি বছর ধরে আমার মতো অসুস্থ একজনের সঙ্গে সংসার করছে সে। আমি আমার ভালোবাসা দিয়ে তাকে জয় করেছি। ‘

তিনি হাত জোড় করে বলেন, ‘আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ, আমার সংসারটি কেউ ভাঙবেন না। আমি একজন প্রতিবন্ধী, আপনাদের মতো আমি সুস্থ নই। ‘ সোহেলের আগের স্ত্রীর সঙ্গে একসাথে থাকতে রাজি জানিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছেও বিষয়টি নিয়ে বিব্রতকর আর কিছু না প্রকাশ করার অনুরোধ জানান রওশন।

তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী আগে একটা বিয়ে করেছিল, এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি তাদের সাথে কথা বলেছি, তাদেরও কোনো আপত্তি নেই। আমরা ভালো থাকলেই ওই পরিবার ভালো থাকবে। তাহলে আপনাদের সমস্যা কোথায়? কেউ কি আমার মতো প্রতিবন্ধী মেয়েকে গ্রহণ করবেন? আমার স্বামী ১৫ বছর আমার পঙ্গুত নিয়ে যে কষ্ট করেছে, আমি কোনো দিন প্রতিদান দিতে পারব না। আমি তাকে জীবনে কিছুই দিতে পারিনি। কেন আমাদের পিছু লেগেছেন আপনারা? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন, সেটা কি আপনারা চান না? দয়া করে আমার পিছু লাগা বন্ধ করুন। আমাদের ভালোভাবে বাঁচতে দিন। ‘

উল্লেখ্য, ১৪ বছর আগে ভালোবেসে ময়মনসিংহের ত্রিশালের প্রতিবন্ধী রওশন আক্তারের সঙ্গে সংসার পেতেছিলেন সোহেল। স্বামীর সাহায্য নিয়েই সকল কাজ করতে হয় রওশনের। এমনকি সোহেল মিয়ার পিঠে চড়েই যাতায়াত করেন বিভিন্ন জায়গায়। তাদের এমন ভালোবাসার গল্প নিয়ে কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বেরিয়ে এসেছে সোহেলের অতীতের এক ঘটনা। সোহেল মিয়ার আসল নাম মোখলেছুর রহমান (বকুল)। বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। আগের সংসারে স্ত্রী ছাড়াও তিন ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

তবে এসব তথ্য গোপন করেছিলেন সোহেল মিয়া। শুধু তা-ই নয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন তিনি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অনুতপ্ত সোহেল বলেন, ‘রওশনকে বিয়ের পর আমি বাড়িতে গিয়েছিলাম ক্ষমা চাইতে, কিন্তু তারা মেনে নেয়নি। আগের সংসারের স্ত্রী-সন্তানরাও চাইত না আমি তাদের পরিচয় দিই। তাই সেই তথ্য সামনে আনতে চাইনি, গোপন করেছি। আমাদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর প্রতিবন্ধী হওয়ায় তাকে ছেড়ে যেতে পারিনি। তার কষ্টের দিকে তাকিয়ে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে ঘরে তুলেছি। ভালোবাসা আর একজন প্রতিবন্ধীর সহায় হতেই আমি আগের সংসার রেখে নতুন করে সংসার পেতেছি। ‘

সোহেল মিয়ার আগের সংসারের বড় ছেলে মো. শিহাব উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ২০০৪ বা ২০০৫ সালের দিকে কাজের কথা বলে ঢাকায় গিয়ে তার বাবা নিখোঁজ হন। তাদের পক্ষে তাকে খুঁজে বের করার সামর্থ্য ছিল না। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত খবর এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আলোচনায় আসা ছবি ও ভিডিও দেখে বাবাকে চিনতে পারেন শিহাব।

শিহাব বলেন, ‘আমরা সোহেল মিয়া বা মোখলেছুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেব না। আর তার দ্বিতীয় স্ত্রী রওশনের তো কোনো দোষ নেই। ‘

সম্প্রতি সোহেল-রওশন দম্পতির ভালোবাসা নিয়ে কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসা খবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েরও নজরে এসেছে। সেখান থেকে তাদের পারিবারিক অবস্থার খোঁজ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বুধবার জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আক্তারুজ্জামান এই দম্পতির বাড়িতে যান এবং তাদের চাহিদা বা প্রয়োজনগুলো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জানাবেন বলে আশ্বাস দেন।

Back to top button