মাদক ব্যবসা আড়াল করতে মাজার গড়ে পিচ্চি মনির

আব্দুল্লাহ মনির ওরফে পিচ্চি মনির। বয়স ৩৩। বাবার নাম মৃত চাতক শাহ। গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর জেলায়। খুব অল্প বয়সেই পেটের দায়ে বাবার সাথে ঢাকায় আসে মনির। বাবা শুরু করেন ফলের ব্যবসা। ছেলে সহায়তা করেন বাবাকে।

সেই বাবার মৃত্যুর পর তার কবরে লাখ লাখ টাকা খরচ করে মাজার বানিয়েছেন ছেলে আব্দুল্লাহ মনির। শুধু তাই নয়, তার গ্রামে এখন কোটি টাকার স্থাপনা রয়েছে। বাবার কবর মাজার বানিয়ে এলাকায় নিজেকে কৃতি সন্তান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মনির।

কিন্তু সব কিছুই করেছেন অবৈধ টাকায়। ঢাকায় মাদকের বড় সিন্ডিকেট চালায় পিচ্চি মনির। একাধিকবার গ্রেপ্তারও হয়েছেন। সবশেষ গতকাল রাতে আবারও গ্রেপ্তার হয়েছেন র‍্যাবের হাতে। পিচ্চি মনির ও তার সহযোগী জুবায়ের হোসেনকে বিদেশি অস্ত্র, ইয়াবা ও নগদ অর্থসহ রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা যায়, পিচ্চি মনিরের পরিবার জীবিকার সন্ধানে ১৯৯৫ সালে ঢাকায় চলে আসে এবং লালবাগ থানার শহীদনগর এলাকায় বসবাস শুরু করে। মনির ও তার পিতা জীবিকা নির্বাহের জন্য ফলের ব্যবসা শুরু করেন।

এক সময় এলাকার বখে যাওয়া ছেলেদের সাথে চুরি, ছিনতাই ইত্যাদির মাধ্যমে অপরাধ জগতে হাতেখড়ি হয় মনিরের। ধীরে ধীরে সে এলাকার বখাটেদের নিয়ে লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর ও কেরানীগঞ্জ থানা এলাকায় একটি অপরাধ চক্র গড়ে তোলে। এই চক্রটি ব্যবহার করে সে মাদক ব্যবসা শুরু করে।

র‍্যাব জানায়, ২০১২ সাল থেকে কামরাঙ্গীরচর এলাকায় পিচ্চি মনির ও তার বন্ধু পার্টনারশীপে মাদক ব্যবসা শুরু করেন। প্রথমে স্থানীয় মাদক ডিলারদের কাছ থেকে অল্প অল্প করে মাদকদ্রব্য ক্রয় করে মাদকসেবীদের কাছে বিক্রয় করত তারা। ২০১৬ সালে কক্সবাজারের ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সাথে মাদক নেটওয়ার্ক তৈরি করে তারা। এরপর টেকনাফ ও কক্সবাজার থেকে নিয়মিত মাদকদ্রব্য সরবরাহ করা হত। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে চলত অর্থ লেনদেন।

র‍্যাবের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানায়, গ্রেপ্তারকৃত মনির প্রতিমাসে মাদকের কয়েকটি চালান টেকনাফ, কক্সবাজার থেকে ঢাকায় নিয়ে আসত। এরপর মিরপুর-১৩, ইসলামবাগ, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, কেরানীগঞ্জ, কামরাঙ্গীরচর, আজিমপুরসহ আরো কয়েকটি এলাকার খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করত। প্রত্যেক খুচরা বিক্রেতার জন্য ভিন্ন ভিন্ন মোবাইল ফোন ব্যবহার করত। কৌশলগত কারণে খুচরা বিক্রেতাদের পরিচয় গোপন রাখা হতো।

২০২০ সালের ডিসেম্বরে মোহাম্মদপুর থানার হাতিরপুল এলাকার তার ২য় স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া করা বাসা থেকে অস্ত্র ও ইয়াবাসহ মনিরকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সে একটি এলাকায় এক থেকে দুই বছরের বেশি অবস্থান করত না।

এভাবেই কোটি টাকার মাদক ব্যবসায়ী হয়েছেন পিচ্চি মনির। নিজ বাড়িতে কোটি টাকার স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। বাবার কৃতি সন্তান দাবি করে একটি মাজার নির্মাণ করছেন।

র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উয়িং-এর পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত রাতে র‌্যাব-২ এর একটি আভিযানিক দল রাজধানীর হাজারীবাগ থানা এলাকাস্থ মধুবাজারের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান পরিচালনা করে মাদক ব্যবসার অন্যতম হোতা আব্দুল্লাহ মনির ওরফে পিচ্চি মনির(৩৩) ও মো. জুবায়ের হোসেনকে (৩৩) গ্রেপ্তার করে।

অভিযানে জব্দ করা হয় ২টি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন, ১২ রাউন্ড তাজা গুলি, ১৮ হাজার ৭৭০ পিস ইয়াবা, ৬ গ্রাম আইস এবং মাদক বিক্রয়লব্ধ নগদ ৪ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা।

খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেপ্তারকৃত মনির ২০১৮ সালে অস্ত্র ব্যবসা শুরু করেন। ওই বছরই অবৈধ পিস্তলসহ আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয় এবং ৭ মাস কারান্তরীণ ছিলেন। পরবর্তীতে ২০২০ সালে অস্ত্র ও মাদক মামলায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়। এ সময় সে এক বছর কারাবরণ করে। তার নামে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অস্ত্র ও মাদকের ৩টি মামলা রয়েছে।

Back to top button